২০ হাজার কিমি নতুন রাস্তা! পথশ্রী–রাস্তাশ্রী

Spread the love

পথশ্রী প্রকল্পের নতুন রাস্তার উদ্বোধন হল তারকেশ্বর ভঞ্জিপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে।

২০ হাজার কিমি নতুন রাস্তা! পথশ্রী–রাস্তাশ্রী ৪ প্রকল্পে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ শুরু বাংলায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন প্রকল্পে বদলে যাবে বাংলার চিত্র !

২০ হাজার কিমি নতুন রাস্তা! পথশ্রী–রাস্তাশ্রী ৪ প্রকল্পে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ শুরু বাংলায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন প্রকল্পে বদলে যাবে বাংলার চিত্র!

—সৌভিক দাস

বাংলার গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নকে সামনে রেখে রাজ্য সরকার যে ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে, তার আরেকটি উজ্জ্বল অধ্যায় যুক্ত হল ‘পথশ্রী–রাস্তাশ্রী ৪’ প্রকল্পের মাধ্যমে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার গ্রামীণ পরিকাঠামো, বিশেষ করে রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছে। কারণ, একটি রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের ভিত্তিই হল যোগাযোগব্যবস্থা। মানুষ যতো দ্রুত, নির্বিঘ্ন ও নিরাপদে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলাচল করতে পারবেন, ততো সহজে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, কৃষিকাজ, শিল্প—সব ক্ষেত্রেই উন্নয়নের সম্ভাবনা বাড়বে। সেই বৃহৎ লক্ষ্যকেই সামনে রেখে কৃষ্ণনগরে আয়োজিত এক জনসভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী ‘পথশ্রী–রাস্তাশ্রী ৪’ প্রকল্পের শিলান্যাস করলেন, যা অন্তত আগামী কয়েক বছর পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের মানচিত্রে একটি নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।

এই প্রকল্পের আওতায় বাংলার প্রায় ২০ হাজার ৩০ কিলোমিটার রাস্তার নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। রাজ্য সরকারের তহবিল থেকে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮,৪৮৭.৮৩ কোটি টাকা। প্রকল্পের বিস্তৃতি এতটাই ব্যাপক যে এর সুফল সরাসরি পৌঁছবে ৩৫ হাজারেরও বেশি গ্রাম ও ১২৮টি পৌর এলাকার মানুষের কাছে। এই উন্নয়নমূলক উদ্যোগ শুধু সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা সহজ করবে না, একই সঙ্গে প্রচুর কর্মসংস্থানের দরজাও খুলে দেবে। রাজ্য সরকার আনুমানিক হিসেব অনুযায়ী বলছে, আগামী দিনে জব কার্ডধারী শ্রমিকদের জন্য তৈরি হবে ১৫ কোটিরও বেশি শ্রমদিবস, যা গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার করবে।

রাজ্যে বর্তমান সরকারের ২০১১ সাল থেকে ধারাবাহিক কাজের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইতিমধ্যেই প্রায় ১ লক্ষ ৮৩ হাজার ৮৪ কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ বা পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দেয় যে মাটি ও মানুষের সরকার হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনের কাছে মানুষের চলাচলের সমস্যা দূর করা, কৃষিজ পণ্যের পরিবহন সহজ করা, ছোট ব্যবসায়ীরা যাতে দ্রুত বাজারের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন—এসবই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। তাই রাজ্যের প্রত্যেক অঞ্চলের রাস্তার সার্বিক উন্নয়নই এখন সরকারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার।

এই বৃহৎ কর্মসূচির অঙ্গ হিসেবেই পথশ্রী প্রকল্পের নতুন রাস্তার উদ্বোধন হল তারকেশ্বর ভঞ্জিপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে। মুখ্যমন্ত্রী কৃষ্ণনগরের সভা থেকে ভার্চুয়াল মাধ্যমে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সংযুক্ত প্রায় হাজারো রাস্তার উদ্বোধন করে দিলেন একসঙ্গে। তারকেশ্বর ভঞ্জিপুরের অনুষ্ঠানস্থলেও ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। উপস্থিত ছিলেন তারকেশ্বর ব্লকের বিডিও, বিভিন্ন কর্মকর্তা, পঞ্চায়েত প্রতিনিধি ও স্থানীয় মানুষ। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের উচ্ছ্বাসই প্রমাণ করে দিচ্ছিল, এই রাস্তার পুনর্নির্মাণ তাদের বহুদিনের দাবি ছিল এবং তা পূরণ হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে গোটা এলাকায়।

পথশ্রী প্রকল্পের মূল দর্শনই হল—বাংলার মাটি ও বাংলার পথকে এমনভাবে গড়ে তোলা, যাতে রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলও উন্নয়নের মূল ধারার সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে যেতে পারে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে যেসব রাস্তার পুনর্নির্মাণ হচ্ছে, তার বেশিরভাগই বহু বছর ধরে অবহেলিত ছিল বা নানাবিধ সমস্যার কারণে সেখানে আধুনিক মানের পরিকাঠামো তৈরি হয়নি। ফলে বর্ষাকালে চলাচলের সমস্যা, কৃষিপণ্যের ক্ষতি, রোগীদের হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি এমন নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হত স্থানীয় মানুষকে। এখন নতুন রাস্তা তৈরি হলে সেই সমস্ত সমস্যা অনেকটাই কমে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তারকেশ্বর ভঞ্জিপুরের পুনর্নির্মিত রাস্তা নিয়ে স্থানীয় মানুষের উৎসাহও ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রামের কৃষকরা জানিয়েছেন, আগে কৃষিজ পণ্য বাজারে নিয়ে যেতে সময় লাগত অনেক বেশি, এবং রাস্তার খারাপ অবস্থার কারণে প্রায়ই পুরনো যানবাহন নষ্ট হয়ে যেত। এখন নতুন রাস্তা তৈরি হলে মাঠ থেকে বাজার কিংবা বাড়ি থেকে শহর—সব জায়গায় পৌঁছনো অনেক দ্রুত ও সুবিধাজনক হবে। স্থানীয় মহিলা কর্মসংস্থান গোষ্ঠীর সদস্যরাও জানিয়েছেন, নতুন রাস্তা হলে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বাজারে যাতায়াত আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে বাড়বে আত্মনির্ভরশীলতার পথও।

এই উন্নয়নমূলক কাজগুলোর সঙ্গে আরও যুক্ত রয়েছে একটি বড় সামাজিক বার্তা। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ‘স্বনির্ভরতাই বাংলার শপথ’—এ কথাটি বারবার বলেছেন। তাঁর মতে, নিজের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে, নিজের সম্পদ ও জনশক্তির মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে উন্নত করতে হবে। পথশ্রী বা রাস্তাশ্রী প্রকল্প সেই দর্শনকেই বাস্তব রূপ দিচ্ছে। শ্রমের সুযোগ বাড়ছে, স্থানীয় ব্যবসা বাড়বে, নতুন যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় বিনিয়োগ আকর্ষণও বাড়বে—এ সবই সম্মিলিতভাবে বাংলার অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করে তুলবে।

এই প্রকল্পের আরেকটি বিশেষ দিক হল পুরো ব্যয় রাজ্য সরকার নিজেই বহন করছে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বড় অঙ্কের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সহজ বিষয় নয়। কিন্তু মানুষের প্রয়োজনই সরকারের কাছে সর্বাগ্রে বলে মনে করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাই আর্থিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। সরকারের দাবি—এটি কেবল একটি রাস্তা নির্মাণ প্রকল্প নয়, এটি বাংলার উন্নয়নের ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করার একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মপ্রক্রিয়া।

পথশ্রী–রাস্তাশ্রী ৪ প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত হলেও তার প্রতিধ্বনি পৌঁছেছে রাজ্যের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শহরাঞ্চল পর্যন্ত। এই প্রকল্প শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, মানুষের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। উন্নত রাস্তা মানেই উন্নত জীবনযাত্রা—এ কথাটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রমাণিত। রাস্তা ভালো থাকলে গ্রামাঞ্চলে শিল্প গড়ে ওঠে, পর্যটন সম্ভাবনা বাড়ে, কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হয়, ছাত্রছাত্রীরা সহজে স্কুল-কলেজে যেতে পারে, স্বাস্থ্যপরিষেবা আরও দ্রুত নাগালের মধ্যে আসে।

তারকেশ্বর অঞ্চলে নতুন রাস্তার উদ্বোধন তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আগামী দিনের উন্নয়নের ভিত্তি। এখানে রাস্তা নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে সামগ্রিকভাবে মানোন্নয়নের কাজও করা হবে, যাতে মাটির ক্ষয় রোধ, জলনিকাশির ব্যবস্থা, রাস্তার দু’ধারে সবুজায়ন—সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘস্থায়ী পরিকাঠামো তৈরি করা যায়। এইভাবে পরিকল্পিত উন্নয়নই এক রাজ্যের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করে।

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী নিজের ভাষণে বারবার বলেছেন—রাজ্যের গ্রামই হল বাংলার প্রাণ, আর সেই গ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যেতেই পথশ্রী প্রকল্প। তাঁর দাবি, রাজ্যে কোনও অঞ্চলই আর পিছিয়ে থাকবে না। প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি গ্রাম—সবাই উন্নয়ন ও মৌলিক সুবিধার অধিকারী হবে। রাস্তা সেই অধিকার পাওয়ার অন্যতম মূল মাধ্যম।

আজ যখন ভঞ্জিপুর গ্রাম পঞ্চায়েতে নতুন রাস্তার কাজ শুরু হল, তখন শুধু স্থানীয় মানুষ নয়, বরং পুরো তারকেশ্বর বিধানসভা যেন এই উন্নয়নের সাক্ষী হয়ে রইল। উপস্থিত বিডিও, কর্মাধ্যক্ষ, স্থানীয় প্রতিনিধিরা স্পষ্ট বললেন—এটি রাজ্যের অগ্রগতির এক বড় উদাহরণ। আগামী দিনে এই এলাকায় আরও বহু উন্নয়নমূলক কাজ হবে, যার ভিত্তি হবে এই নতুন রাস্তা।

সুতরাং, পথশ্রী–রাস্তাশ্রী প্রকল্প পশ্চিমবঙ্গের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি শুধু যোগাযোগব্যবস্থাকে মজবুত করবে না, সামগ্রিক উন্নয়নকে গতিশীল, সুষম ও দীর্ঘস্থায়ী করে তুলবে। বাংলার মাটি ও বাংলার পথকে শক্তিশালী করাই এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য, কারণ উন্নয়নের পথ শুরুই হয় রাস্তা দিয়ে। আর সেই পথকে আরও দৃঢ়, আরও নিরাপদ, আরও ব্যবহারোপযোগী করে তোলাই এখন মা-মাটি-মানুষের সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু বর্তমান প্রজন্মই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এর সুফল পাবে। গ্রাম থেকে শহর—সবাই এগিয়ে যাবে উন্নয়নের পথে। বাংলার মাটিতে আবারও প্রতিষ্ঠিত হবে স্বনির্ভরতার এক নতুন অধ্যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *